স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর দর্শন ।

স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর দর্শন । 

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন , “ উপনিষদের প্রতি পাতায় আমাকে যার কথা বলা হয়েছে তা হল সাহস । এইটিই সবচেয়ে মনে রাখবার কথা । আমার জীবনে এই একটি বড়াে শিক্ষাই আমি নিয়েছি । হে মানুষ ! বীর্যবান হও , দুর্বল হােয়াে না ! ” 

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন , “ জাতি হিসেবে আমরা যা কিছু । পেয়েছি সবই আমাদের দুর্বল করেছে । ” মনে হয় সেই সময় জাতির জীবনের একটিই উদ্দেশ্য ছিল , কী করে আমাদের দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা যায় । শেষ পর্যন্ত আমরা কেচোতে পরিণত হয়েছি , যে কেউ তরবারি দেখিয়ে আমাদের পদানত করেছে তার । পায়ের তলায় থাকবার জন্যে । 

আমি যা চাই তা হল লৌহনির্মিত পেশী এবং স্বাস্থ্য । শক্ত ধাতুতে নির্মিত মন । পৌরুষের পূজা করাে । 

সব শক্তি তােমার মধ্যে আছে । তুমি সব কিছু করতে পার , তা বিশ্বাস করাে ভেবােনা তুমি দুর্বল । তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার । কারও নির্দেশ ছাড়াই । সবশক্তি তােমার মধ্যে আছে । উঠে দাঁড়িয়ে | তােমার ভিতরকার দেবত্বকে প্রকাশ করাে । 

তােমার দেশ বীর চায় , বীর হও । পাহাড়ের মত দৃঢ় হও । সত্য সর্বদা জয়ী হয় , দেশের লােক যা চায় তা হল জাতির ধমনীতে বিদ্যুৎ প্রবাহ , দেশের মধ্যে প্রাণশক্তি জাগিয়ে তুলতে হবে । সাহসী হও , মৃত্যু একবারই আসে । হিন্দুদের ভীরু হলে চলবে না । ভীরুতা আমি ঘৃণা করি । মনে গভীর শান্তি বজায় রাখাে । তােমার বিরুদ্ধে বালখিল্যের কী বলল তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করাে না । অগ্রাহ্য করাে ! অগ্রাহ্য করাে অগ্রাহ্য করাে ! সমস্ত বড়াে বড়াে কীর্তিই স্থাপিত হয়েছে বিশাল বিশাল বাধা অতিক্রম করে । পুরুষ ব্যঘের মত চেষ্টা করাে । 

বন্ধু , ক্রন্দন করছ কেন ? সমস্ত শক্তি তােমার মধ্যেই আছে , তােমার সর্বশক্তিমান স্বভাবকে জাগ্রত করাে । তাহলে সমগ্র বিশ্ব তােমার পায়ের তলে লুটিয়ে পড়বে । মুর্খরা কাতরস্বরে বলে , “ দুর্বল আমরা দুর্বল ” । জাতি চায় কাজ এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিভা । আমাদের প্রয়ােজন মহৎ আত্মা , প্রবল শক্তি এবং অসীম উৎসাহ । উদ্যোগী পুরুষসিংহেরই লক্ষ্মীলাভ হয় । পিছনে তাকানাের প্রয়ােজন নেই , আমরা চাই অসীম প্রাণশক্তি , অসীম উৎসাহ , অসীম । সাহস এবং ধৈর্য । একমাত্র তাহলেই বড়াে কিছু সাধিত হতে পারে । 

বেদ কোনও পাপ স্বীকার করে না , একমাত্র ভুল স্বীকার করে । বেদের মতে সব চেয়ে বড়াে ভুল এ কথা বলা যে তুমি দুর্বল , তুমি । পাপী , এক হতভাগ্য জীব , তােমার কোনও শক্তি নেই , তুমি এই কাজ , কি ওই কাজ করতে পার না । 

শক্তিই জীবন , দুর্বলতা মৃত্যু , শক্তি সুখ , জীবন অনন্ত মৃত্যুহীন । দুর্বলতা সর্বক্ষণের কষ্টভােগ , দুর্বলতা মৃত্যু । সদর্থক মনােভাবসম্পন্ন । হও , শক্তিশালী হও । শৈশব থেকেই এমন সব চিন্তা তােমার মস্তকে প্রবেশ করুক যে চিন্তা সহায়তাকারী । দুর্বলতাই দুঃখ ভােগের । একমাত্র কারণ । আমরা দুঃখভােগ করি , কারণ আমরা দুর্বল । আমরা মিথ্যা বলি , চুরি করি , খুন করি , অন্যান্য অপরাধ করি তার কারণ - আমরা দুর্বল , আমরা যন্ত্রণা পাই কারণ - আমরা দুর্বল । আমাদের মৃত্যু হয় কারণ আমরা দুর্বল । যেখানে দুর্বলতার কারণ । নেই , সেখানে মৃত্যু নেই , দুঃখ নেই , একমাত্র প্রয়ােজন শক্তি । শক্তি । জগতের ব্যাধির ঔষধ । প্রবলের দ্বারা অত্যাচারিত দুর্বলের ঔষধ শক্তি । বিদ্বানের দ্বারা অত্যাচারিত অজ্ঞ ব্যক্তির ঔষধ শক্তি । এক পাপী যখন অন্য পাপীর দ্বারা অত্যাচারিত হয় তার ঔষধ শক্তি । উঠে দাঁড়াও , সাহসী হও , শক্তিমান হও , সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে নাও এবং জানাে , যে তুমি তােমার ভাগ্যের নিয়ন্তা । যত শক্তি , যত সহায়তা আমাদের চাই , সব তােমার নিজের মধ্যেই আছে । অতএব নিজের ভবিষ্যৎ নিজে গঠন করাে । 

সারাক্ষণ যদি মনে করি আমরা ব্যধিগ্রস্ত , ব্যাধি সারবে না । দুর্বলতার কথা মনে করিয়ে দিলে বিশেষ সহায়তা হয় না । সারাক্ষণ দুর্বলতার কথা । ভাবলে শক্তি আসে না , দুর্বলতা নিয়ে চিন্তা করলে তাতে দুর্বলতার অবসান হয় না , শক্তি নিয়ে চিন্তা করলে দুর্বলতার অবসান হয় । 

এই জগতে এবং ধর্মের জগতে এই সত্য । ভয়ই অধঃপতনের এবং পাপের নিশ্চিত কারণ । ভয়ই দুঃখকে ডেকে আনে । ভয়ই । মৃত্যুকে ডেকে আনে , ভয়ই অশুভের জন্ম দেয় । 

ভয় কোথা থেকে আসে ? আমাদের স্বভাব সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকে । আমরা প্রত্যেকে রাজাধিরাজের অর্থাৎ ঈশ্বরের যুবরাজ । । জেনে রাখাে , সমস্ত পাপ , সমস্ত অশুভকে এক কথায় বলা যায় । দুর্বলতা । সমস্ত মন্দ কাজের পিছনে শক্তি জোগাচ্ছে দুর্বলতা । সমস্ত স্বার্থপরতার উৎস দুর্বলতা । দুর্বলতার কারণেই মানুষ মানুষকে আঘাত । করে , দুর্বলতার কারণেই মানুষ যা নয় নিজেকে সেই ভাবে দেখায় । 

আমাদের জনসাধারণের এখন যা প্রয়ােজন তা হল লােহার পেশী , ইস্পাতের স্নায়ু , প্রচণ্ড এক ইচ্ছা শক্তি , যাকে কিছুতেই প্রতিরােধ করতে পারে না , যা বিশ্বের রহস্য ভেদ করে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে , যে কোনােভাবেই হােক , তার জন্যে যদি সাগরের তলে যেতে হয় , মৃত্যুর মুখােমুখি দাঁড়াতে হয় , তবুও । 

আমরা অনেক দিন ক্রন্দন করেছি , এখন নিজের পায়ে দাড়াও , মানুষ হও । আমাদের প্রয়ােজন এমন ধর্ম যা মানুষ তৈরি করে । আমাদের প্রয়ােজন এমন তত্ত্ব যা মানুষ তৈরি করে । আমাদের এমন সর্বাঙ্গীণ শিক্ষা প্রয়ােজন যা মানুষ তৈরি করে এবং এইখানেই সত্যের পরীক্ষা । যা কিছু তােমাকে শারীরিকভাবে , বুদ্ধি বৃত্তিকে আত্মিক শক্তিকে দুর্বল করে , তাকে খারিজ করাে । যাতে প্রাণ নেই , তা সত্য হতে পারে না । সত্য শক্তি দেয় , সত্য পরিত্রাতা , সত্য । সকল জ্ঞান । সত্য অবশ্যই শক্তিদাতা আলােকদাতা । 

আমরা তােতা পাখির মতাে অনেক কথা বলি , কিন্তু কাজ করি । । কথা বলা , কাজ না করা আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে । তার কারণ কী ? শারীরিক দুর্বলতা । এরকম দুর্বল মস্তিষ্ক কোনও কাজ করতে পারে না । মস্তিষ্কের শক্তি আমাদের বাড়াতে হবে । সর্ব প্রথম আমাদের যুবকদের সবল হতে হবে । ধর্ম আসবে তার পরে , কৃষ্ণের । বিশাল প্রতিভা ও বিশাল শক্তি তােমরা তখনই উপলব্ধি করতে পারবে যখন তােমাদের ধমনীতে শক্তিশালী রক্ত প্রবাহিত হবে । । তােমরা উপনিষদ এবং আত্মার মহিমা আরও ভাল করে বুঝতে পারবে , যখন তােমাদের শরীর তােমাদের পায়ের উপর শক্ত হয়ে । দাঁড়াতে পারবে এবং তােমরা অনুভব করবে যে তােমরা মানুষ । 

নীতি - পরায়ণ হও , সাহসী হও , সর্বান্তঃকারণে কঠোরভাবে নীতি - পরায়ণ মানুষ হও , সাহসী হও , বেপরােয়া হও । কাপুরুষেরা পাপ করে , সাহসীরা কখনােই নয় । প্রত্যেককে , সকলকে ভালােবাসার চেষ্টা করাে । 

উঠে দাঁড়াও , জোয়ালে কাঁধ লাগাও । জীবন কত দিনের ? একবার যখন পৃথিবীতে এসেছ , একটা চিহ্ন রেখে যাও । তা না হলে গাছ আর পাথরের সঙ্গে তােমার তফাৎ কী ? তারাও জন্মায় , তারাও ক্ষয়প্রাপ্ত হয় , মারা যায় । 

সাহসী হও । আমার সন্তানেরা সবার উপরে সাহসী হবে । কোনাে কারণে একটুও আপােস নয় । সর্বোচ্চ সত্য শেখাও।  সম্মান হারানাের ভয় কোরাে না , অপ্রিয় সংঘাত সৃষ্টি করাকে ভয় করাে । না । জেনে রাখাে , সত্যকে ত্যাগ করার প্রলােভন সত্ত্বেও সত্যের সেবা করতে হবে ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিষ্ণু দশ অবতারের পরিচয়

বেদের চনৎকার কিছু শ্লোক।

হিন্দুদের দৈনিক প্রার্থনার মন্ত্র